মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংষ্কৃতি

 

চট্টগ্রাম একটি প্রাচীন ভূখ- এবং ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ। শত শত বছরের পথ পরিক্রমায় এখানে এসেছেন বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মানুষ। কেউ এসেছেন বসতি স্থাপন করতে , কেউ ব্যবসার উদ্দেশ্যে , কেউ রাজ্য স্থাপন করতে, কেউ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে , কেউ ধর্মপ্রচার কিংবা চাকরি সূত্রে আর কেউ এসেছেন প্রকৃতির অপরূপ শোভা-শামত্মময় পরিবেশে একামেত্ম সৃষ্টি কর্তাকে পাবার আশায়। তাই চট্টগ্রাম পরিণত হয়েছে জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মিলনকেন্দ্র রাপে। যে কারণেই হউক এখানে যখন যারা এসেছে , চট্টগ্রামকে ভাল না বেসে পারেনি। চট্টগ্রামের অনিন্দ্র-সুন্দর প্রকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদ. এর ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগ সুবিধা, উর্বর ভূমি, এর জলবায়ু ও আবহাওয়া সমসত্ম কিছুতেই মানুষ মুগ্ধ হয়। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যমত্ম কোন মানুষ একবারের জন্য এলেও চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাসের চিন্তা করেন। ছান্দসিক কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়-

সিন্ধু- মেখলা ভূধর-সত্মনী রম্যানগরী চট্টগ্রাম

অয়ি বরাঙ্গী! শ্যামলা, শোভনা,নিবিড় কানন কুমত্মলা।

নীলিমা- শ্যামলে, কঠিনে-কোমলে অপরূপা রূপস্ফুর্তি গো

চট্টলা তুমি বঙ্গভবভূমির ভুবনেশ্বরী মূর্তি গো।

স্থলপথে চট্টগ্রামের প্রবেশ পথ মীরসরাই। পশ্চিমে সাগর ও ফেনী নদী ঘেরা বিশাল বিসত্মুত চরাঞ্চল , পূর্বে সুউচ্চ পর্বতমালা বেষ্টিত বনভূমি, মাঝে উত্তর- দক্ষিণে ২৫কি.মি.’র অধিক দীর্ঘ সমতল ভূমি নিয়ে গঠিত মীরসরাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। পূবাঞ্চলে পর্বতমালার পাদদেশে ছোট ছোট টিলা যেমন এর ভূ-সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে তেমনি পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট ছোট খাল ও ছরা এখানকার ফসলীভূমিকে করে তুলেছে উর্বর ও শস্য শ্যামল । উর্বর শস্যক্ষেত ও পূর্বের পাহাড়িয়া এলাকার সবুজ গাছগাছালি, পশ্চিমে সমুদ্র উপকুলে মাইলের পর মাইল বিস্ত্তত মনুষ্য সৃষ্ট বনভূমি দিগমত্ম বিসত্মূত জলরাশি ও চরাঞ্চল এই জনপদকে দিয়েছে চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা , আচার-ঐতিহ্য ও সংস্কূতির উপর এখানকার প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের বিশেষ প্রভার রয়েছে । সামাজিক সৌহার্দ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক ভালবাসা এবং শামিত্মপূর্ণ সহাবস্থানের ক্ষেত্রে মীরসরাই অঞ্চলের মানুষের রয়েছে হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সুনাম । সংখ্যাগরিষ্ট মুসলসানদের আট শতাধিক মসজিদ দরগাহ, হিন্দু ও বৌদ্ধদের দেড় শতাধিক মন্দির ও তীর্থস্থান পাশাপাশি অবস্থান করে এই অঞ্চলকে সর্বজাতির , সর্ব ধর্ম-মতের ও সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত করেছে। প্রকৃতির নন্দনকানন এই মনোহর জনপদ যুগে যুগে অসংখ্য কবি- সাহিত্যিক , সূফী সাধক মুনি-ঋষি, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক , স্বাধীনতা সংগ্রামী দেশপ্রেমিকের জন্ম দিয়েছে। চট্টগ্রামের বার আউলিয়াখ্যাত সাধক হয়রত শাহ জাহেদ আল হোসাইন আল ইরানী , হয়রত বদল মোসত্মান , হয়রত মিয়া নুর আলী শাহ আল আরাবী এবং হয়রত খাজা কাজী মোয়াক্কেল ,হয়রত চিনকি মোসত্মান , বালাকোটের গাজী হয়রত সুফী মুহম্মদ নিজামপুরীসহ অগণিত পুণ্যবান সুফী সাধকের পদ স্পর্শে ধন্য এই মীরসরাই। এক কথায় বলতে গেলে মীরসরাই ভূখন্ড ,এর অবস্থান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য় ও সম্পদ এর সাথে এখানকার মানুষের সংগ্রামী চেতনা , কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্যশীল মনোভাব বৃহত্তর চট্টগ্রামে তো বটেই, এমনকি সমগ্র দেশে মীরসরাই ও এখানকার জনগণের রয়েছে সম্মান ও গৌরবময় অবস্থান। ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্টগত কারণে মীরসরাই’র অধিবাসীরা সাহসী, উদার ও সংগ্রামী মানসিকতার অধিকারী । একদিকে এখানকার মানুষ বছরের পর বছর প্রাকৃতিক অধিকারী।একদিকে এখানকার মানুষ বছরের পর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করেছে , তেমনি বিদেশি শাসকগোষ্ঠীর রত্তচÿুকেও পরোয়া করে নি । বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনু সংগ্রাম থেকে শুরু করে পাকিসত্মান আন্দোলন , বায়ান্ন’ন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন , বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন , ছয় দফা ও ঊনসত্তরের গণ আন্দোলনে এখানকার মানুষের গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুত্তিযুদ্ধে জান -মাল অকাতরে বিলিয়ে মীরসরাই ও মীরসরাইবাসী ইতিহাসে অনন্য স্থান করে নিয়েছে। একথা সত্যি যে , চট্টগ্রামের একক কোন ইতিহাস গ্রন্থ আজ পর্যমত্ম রচিত হয়নি । কিন্তু খন্ডিত আকারে রচিত ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে মীরসরাই ও এখানকার জনগণের বীরত্বের কথা , এ জনপদের ইতিহাস , সমাজ , সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা, এখানকার সম্পদ - সম্ভাবনার কথা , সুখ-দুখের কথা, মানুষের ভাল-মন্দের কথা কখনো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। এই বিষয়টি চিমত্মা করে আমি দীর্ঘ পনের বছরের অব্যাহত সাধনা ও পরিশ্রমে মীরসরাই’ র ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছি । যা একটি আকরগ্রন্থ বলে স্বীকৃত এবং দেশ বিদেশের ইতিহাসবিদ ও ঐতিহ্য -ইতিহাস সচেতন মনীষী ও সমালোচক কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে । যে গ্রন্থের দীর্ঘ মুখবন্ধ রচনা করেছেন । উপমহাদেশের প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ ও মুদ্রাতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. আবদুল করিম।

 

সীমানা , ভৌগোলিক বিবরণ ও বৈশিষ্ট্:

মীরসরাই চট্টগ্রামের উত্তর-পশ্চিম প্রামেত্ম এবং ২২.৪৭ উত্তর দ্রাঘিমাংশ ও ৯১.৩৫ পূর্ব অক্ষাংশে অবস্থিত। এর উত্তরে ফেনী নদী ও ভারত , পূর্বে সুউচ্চ-সুদীর্ঘ পর্বতমালা ও ফটিকছড়ি , পশ্চিমে ফেনী নদী, বঙ্গোপসাগরের মোহনায় সন্দ্বীপ চ্যানেল এবং বৃহত্তর নোয়াখালীর(ফেনী জেলা) সোনাগাজী ও ছাগলনায়া উপজেলা , দক্ষিণে রয়েছে সীতাকুন্ড উপজেলা। গড়ে মীরসরাই’র আয়তন ৪৮২.৮৮বর্গ কি.মি। ইউনিয়ন ১৬ , মৌজা ১১৩ ,গ্রাম ২০৭ ,শিক্ষার হার ৩৭.২% , পৌরসভা ২ এবং জনসংখ্যা ৩,২৫,৭১২ (সূত্র-১৯৯১ সালের আদমশুমারী ও মীরসরাই উপজেলা প্রশাসনিক দপ্তর)। ব্যতিক্রমী ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে মীরসরাই শত শত বছর পূর্বে থেকে বিদেশে বণিক , পর্যটক , শাসক ও বসতি স্থাপনকারীদের আকৃষ্ট করেছে । চট্টগ্রাম শহর ও বন্দর থেকে মীরসরাই সদরের দূরত্ব প্রায় ৬০ কি.মি এবং ভারত সীমামত্ম থেকে ২৫ কি.মি.দক্ষিণে। সুপ্রাচীন ফেনী নদী ভারত বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছে এবং ফেনী (বৃহত্তর নোয়াখালী ) ও চট্টগ্রাম জেলাকে পৃথক করেছে। সুপ্রাচীনকাল থেকে চট্টগ্রাম ছিল বহি:শক্রমণের লÿ্যবসত্ম এবং স্থল পথে আক্রমণ-পরিচালিত হতো মীরসরাই’র উপর দিয়ে। বিগত দুহাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দীর্ঘকাল চট্টগ্রাম শাসন করেছে আরাকানী শাসকগোষ্ঠী। তাদের জন্য হুমকি স্বরূপ ছিল ত্রিপুরা ও গৌড়ের পাঠান রাজশক্তি এবং পরবর্তীতে মোগল সৈন্যবাহিনী। তাই হিঙ্গুলীতে একটি প্রতিরক্ষা দুর্গ ও প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। দুর্গের অভ্যমত্মরে সৈন্যবাহিনী , তাদের অস্ত্রশস্ত্র , খাদ্যদ্রব্য, হাতি এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ অবস্থান করতো । মীরসরাই’র মাটিতে আরাকানী সৈন্যরা ত্রিপুরা , গৌড়ের পাঠান ও মোগল সৈন্যদের সাথে বহুবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে ফখরম্নদ্দীন মোবারক শাহের সেনাপতি কদল খান গাজী ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে ফেনী পার হয়ে মীরসরাই এলাকায় প্রবেশ করেন ও আরাকানী সৈন্যদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম দখল করেন । সেটাই ছিল সর্বপ্রথম মুসলমানদের চট্টগ্রাম বিজয় এবং সে থেকে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যমত্ম ( মাঝে কয়েক বছর বাদে) চট্টগ্রাম মুসলিম শাসনাধীনে ছিল। এরপর চট্টগ্রাম আরাকান শাসনে চলে যায় এবং ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে বুজুর্গ উমেদ খাঁ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয় পর্যমত্ম তা অব্যাহত থাকে। পঞ্চদশ শতকের শেষ ও ষোল শতকের প্রথমার্ধে চট্টগ্রাম শাসর করেন গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ও তৎপুত্র নাসিরম্নদ্দীন নসরৎ শাহ । চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন রাসিত্ম খাঁ ও পরবর্তীতে লস্কর পরাগল খাঁ ও তৎপুত্র ছুটি খাঁ । চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপিত হয় পরাগলপুরে , যা লস্করপুর নামে খ্যাত হয়। এখানে রাজধানী স্থাপন করে লস্কর পরাগল খাঁ ও পুত্র ছুটি খাঁ ত্রিশ বছরের বেশি সময় চট্টগ্রাম শাসন করেন। অত:পর দিলস্নীতে ক্ষমতার পালাবদল হয়। মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে শের শাহ সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হন এবং তিনি গৌড় অধিকার করেন। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের শাসনভার চলে যায় শের শাহের ভাই নিজাম শাহ এর হাতে । তিনি উত্তর চট্টগ্রামের ভৌগোলিক সামরিক ও অর্থনৈতিক গুরত্ব বিবেচনা করে ফেনী নদীর তীরবর্তী জাফরাবাদে রাজ্য স্থাপন করেন যা পরবর্তী নিজামপুর পরগনা নামে ইতিহাস প্রসিদ্ধি পেয়েছে । মধ্যযুগে নিজামপুর ছিল চট্টগ্রামের একমাত্র পরগনা যার সীমানা উত্তরে পশ্চিমে ফেনী নদী থেকে দক্ষিণে চট্টগ্রাম শহরতলী ( নিশ্চিতভাবে কাটগড় ) পর্যমত্ম বিসত্মূত ছিল । মোগল আমলের পুরো সময়ে এমনকি ইংরোজ যুগের প্রথমাও নিজামপুর এর গুরম্নত্ব অব্যাহত ছিল । মধ্যযুগে লস্করপুর প্রকাশ পরাগলপুর ছিল প্রশাসনিকভাবে চট্টগ্রামের সবচাইতে মর্যাদাশীল অঞ্চল । এখানকার রাজসভায় সভাকবি ছিলেন যথাক্রমে কবীন্দ্র পরমেশ্বর দাশ ও শ্রীকর নদী । প্রথমোওজন লস্কর পরাগলী মহাভারত এবং দ্বিতীয় জন ছুটি খাঁর আদেশে মহাভারতের অশ্বমেধ যজ্ঞ পর্ব বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন , যা ছুটি খাঁনি মহাভারত নামে বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে সমাদৃত । লস্করপুর , বা পরাগলপুরের পরিচয় দিতে গিয়ে কবি শ্রীকর নন্দী লিখেছেন-

চাটিগ্রাম নগরের নিকট উত্তরে

চন্দ্রশেখর পর্বত কন্দরে।।

চারুলোল গিরি তার পৈতৃক বসতি

বিধিএ নির্ম্মিল তাঁক কি কহিব অতি।।

পরি বর্ণ বসে লোক সেনা সন্নিহিত

নানা গুণে প্রজা সব বসত্র তথাত ।।

ফনী নামে নদী এ বেষ্টিত চারিধার

পূবর্ব দিকে মহা গিরী পার নাহি তার।।

লস্কর পরাগল খাঁনের তনয়

সমরে নির্ভএ ছুটি খান মহাশয়।।

 

নামকরণ ও প্রাসাঙ্গিক ইতিহাসঃ

১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গদেশ জয়ের পর বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসার বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় । অবশ্য অষ্টম শতকেই চট্টগ্রামে আরব দেশের বণিকদের আগমণ ঘটে । চট্টগ্রাম অঞ্চল বন্দর , পাহাড় , নদী-সাগর ও উর্বর ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়াতে বিদেশিদের মনযোগ আকর্ষণ করে। তাছাড়া দূর ও নিকট প্রাচ্যের দেশগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর বিশেষ পরিচিতি পায়। আরবীয় বণিকদের সাথে সাথে ধর্ম প্রচারকদের আগমণের ফলে চট্টগ্রামের সামাজিক রাজনৈতিক ,অর্থনৈতিক ও সাংস্কূতিক ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে ধর্ম প্রচারক সুফী সাধকগনের মাধ্যমে । চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে তা আরো বেশি প্রযোজ্য । এখানে উলেস্নখ্য যে , মধ্যযুগে ভারতবর্ষে ধর্মের আবির্ভাবের প্রাক্কালে নিমণবর্ণের হিন্দুরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বর্ণ-বৈষম্য ও অর্থনৈতিক যাঁতাকলে পড়ে নিষ্পেষিত হচ্ছিল । উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণদের হাতে নির্যাতিত হিন্দুরা মুক্তির পথ খুঁজছিল । এসময় নবাগত ইসলাম ধর্ম সকলের সামনে মুক্তি ও সৌভাগ্যের দরজা খুলে দেয়। দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্মের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় লাভ করে । ভারতবর্ষের বৌদ্ধরা ও নির্যাতত হয়ে ক্রমশ: আরাকানের বৌদ্ধ শাসিত চট্টগ্রামের দিকে সরে আসছিল । ভারতবর্ষের সামাজিক , সাংস্কূতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অসহনীয় ও অস্থির এই প্রেক্ষাপটে মুসলমান ব্যবসায়ী ও সৈন্যদের সাথে মুসলিম ধর্মপ্রচারকগণ চট্টগ্রামে আগমণ করেন। অমায়িক ব্যবহার , সেবাধর্মী মনোভাব , ধৈর্য-সহিষতা , খোদাভত্তি ও ভীতি সাধারণ মানুষের মনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করে। এখানকার স্থানীয় মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। পীর দরবেশগণ চট্টগ্রামে মসজিদ , মক্তব ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন। ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম বলেন ‘ বাংলায় মসজিদ স্থাপনের পর থেকে মুসলমানরা একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। ’ ঐতিহাসিকদের অভিমত , ১২২০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী ২/২’শ বছরে যেখানে ৩ লাখ মুসলমান বসবাস করতো সেখানে ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে সে সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় কোটির ওপর । চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেতে এ পরিসংখ্যান আরো বেশি প্রযোজ্য। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পূর্ববাংলা ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্গম ও অধিক অনুন্নত । তাই এখানে ইসলাম প্রচার একটু বেশি দেরিতেই হয়। চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার ও এখানে মুসলমানদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আরো দেড়’শ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল । সড়কপথে চট্টগ্রামে যাওয়ার কোন পথ ছিল না । অসংখ্য নদী- ছড়ায় পরিপূর্ণ অঞ্চলটি বছরের পুরো সময় পানিতে তলিয়ে থাকতো । তাছাড়া চট্টগ্রাম শত শত বছর ধরে আরাকানী মগদের শাসিত ছিল এবং ত্রিপুরার সাথে প্রায়ই যদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকতো । সমুদ্রপথ ও ছিল ভীতিকর । আরাকানী জলদস্যুর অত্যাচারে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ ছিল দিশেহারা । চট্টগ্রাম অঞ্চল সত্যিকার অর্থেই ছিল ‘মগের মুলস্নুক’। এমন পরিস্থিতিতে প্রখ্যাত সুফী হযরত বদর শাহ চট্টগ্রামে আসেন ও ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত হন। তাঁর সাথে এসে যোগ দেন বেশ ক’জন আউলিয়া-দরবেশ, যারা বার আউলিয়া নামে পরিচিত হয়। কিন্তু আরাকানী মগ শাসিত চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারের পরিবেশ মোটেও অনকূল ছিল না । নানা বাধা-বিপত্তি ও অত্যাচার নির্যাতন চলে নবদীক্ষত মুসলমানদেন ওপর। হযরত বদর শাহ (রঃ) ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করে বাংলার সুলতান ফখরম্নদ্দীন মোবারক শাহ (১৩৩৮-৫০) কে চট্টগ্রামে অভিযান পরিচালনার আহবান জানান। সুলতান সে আহবানে সাড়া দিয়ে সেনাপতি কদল খানকে চট্টগ্রামে অভিযান পরিচালনা করেন ও আরাকানী সৈন্যদের বিতাড়িত করেন। গাজী উপাধিতেক ভূষিত হন সেনাপতি কদল খান। কিন্তু মুসলমানদের প্রথম চট্টগ্রাম বিজয় নিয়ে কোন ঐতিহাসিক তথ্যাদি পাওয়া যায়না । চট্টগ্রাম বিজয়ের প্রায় তিন’শ বছর পর চট্টগ্রামের কবি মোহাম্মদ খান তাঁর মক্তুল হোসেন কাব্য রচনা করেন। সেই কাব্যে নিজের বংশ মর্যাদার কথা লিখতে গিয়ে কবি মোহাম্মদ খান লিখেছেন-

এক মনে প্রণাম করম বারে বার

কদল খান গাজী পীর ত্রিভুবন সার।।

যার রণে পড়িল অক্ষয় রিপুদল

ভএ কেহ মজ্জিগেল সমুদ্রের তল।।

এক সর মহিন হৈল প্রাণ হীন

রিপু জিনি চাটিগ্রাম কৈলা নিজাধীন।।

কবি পুসত্মকের আকার বৃদ্ধি পাবার আশংকায় চট্টগ্রাম বিজেতা কদল খান গাব্দী, শায়খ শরীফ উদ্দিন ও বদর আলম অর্থাৎ হযরত বদর শাহ ব্যতিত বার জন আউলিয়ার অন্যদের নাম বলেননি। চট্টগ্রাম বিজয়ের মাত্র ছয় বছর পর ১৩৪৬ সালে চট্টগ্রাম আসেন বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা্ । তিনি চট্টগ্রাম হয়ে সিলেট যান ও সেখানে অবস্থানরত সিলেট বিজেতা হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনীর সাথে দেখা করেন। চট্টগ্রাম অধিকারের পর এখানে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং প্রচুর সংখ্যক সুফী দরবেশ আগমণ করেন । চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েন। সে সময় পর্যমত্ম মীরসরাইর স্বতন্ত্র কোন নাম জানা যায় না, চট্টগ্রামের অংশ হিসেবেই ছিল তার পরিচিতি । পরবর্তীতে আলা উদ্দিন হোসেন শাহের আমলে চট্টগ্রামের উত্তর- পশ্চিমাঞ্চল শাসন করেন লস্কর পরাগল খান ও তৎপুত্র ছুটি খান। এসময় এ অঞ্চল লস্করপুর নামে পরিচিত হয়। লস্করপুর একটি প্রশাসনিক অঞ্চল ,এখানে রাজসভা ছিল , ছিল সভাকবি । যেখানে বাংলা সাহিত্য চর্চা হতো। ছিল সৈন্যবাহিনী , সভাসদ ও প্রশাসনিক দপ্তর । সুলতানী আমলের পর চট্টগ্রামে শাসনভার চলে যায় সুর বংশের নিজাম শাহ সুরের হাতে। তিনি জাফরাবাদে রাজ্য স্থাপন করেন । এখানে ও রাজসভা ছিল । ছিল সভাকবি । যেখানে বাংলা সাহিত্য চর্চা হয়েছে। ছিল সৈন্য সামমত্ম , সভাসদ ও প্রশাসনিক দপ্তর । জাফরাবাদ মীরসরাই’র পশ্চিমাঞ্চলের নদী তীরবর্তী স্থান ,যা ফেনী নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে। তবে জাফরাবাদে নামে মৌজা রয়েছে সীতাকুন্ড ও মীরসরাইতে। চট্টগ্রামের অন্যনাম জাফরাবাদ একথা জানা যায় এই রাজ্যের সভাকবি ও রাজস্ব উজির বাহরাম খানের ‘ইমাম বিজয়’ কাব্যে-

সহর জাফরাবাদ নামে চাটিগেরাম

তথাতে বৈস এ পীর বদ(র.) আলম।।

দো আদশ আউলিয়া বর জগত উত্তম

একে ২ স্থাপিত মোকাম মনোরম্।।

এই জাফরাবাদ রাজ্যই পরবর্তীকালে নপতি নিজাম শাহের নামে নিজামপুর পরগনা রূপে প্রকাশ পায়। উলেস্নখ্য যে , নিজাম শাহের রাজত্বের প্রায় অর্ধ শত বছর পর ১৬১৬ সময় থেকে নিজামপুর নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে জাফরাবাদ শহরটি ফেনী নদীতে বিলীন হয়ে যায়্ । গবেষক শেখ এটিএম রম্নহুল আমিনের মতে‘‘হনডেন ব্রকের অংকিত মধ্যযুগের একটি মানচিত্রে ফেনী সাগর সংগমে জাফরাবাদ নামে একটি বন্দরের উলেস্নখ আছে । সে বন্দর নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। ’’ তাঁর মতে ‘‘দৌলত উজির বাহরাম খানের কাব্যে বণির্ত ‘ সহর জাফরাবাদ এবং ব্রকের মানচিত্রের ‘ জাফরাবাদ বন্দর ’ এক এবং অভিন্ন।’’ নিজামপুর পরগনার একাধিক জাফরাবাদ মৌজা রয়েছে । ১৮৩৭-৩৮ সালে লেফটেন্যান্ট এইচ , সিডনস ইঞ্জিনিয়ার চট্টগ্রাম জেলা জরিপ করেন । এসময় প্রস্ত্ততকৃত ম্যাপে অমত্মত : ১০টি জাফরাবাদ নাম পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ৭ টি মৌজা বর্তমান মীরসরাইতে অমত্মভুর্ক্ত হয়েছে। যেগুলো পরবর্তীতে সময়ে সময়ে নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে মোটবাড়িয়া , পুর্ব মিঠানালা , মিঠাছড়া, রাঘবপুর , রাজাপুর , বামনসুন্দর ও পশ্চিম মলিয়াইশ নামে নামকরণ হয়েছে। এবার আসা যাক মীরসরাই নামকরণ প্রসঙ্গে। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে আলা উদ্দিন হোসেন শাহ গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণের পূর্ববর্তী দুই দশক দেশের পরিস্থিতি অশামত্ম ছিল এসময় চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন রাসিত্ম খাঁ। তাঁর পুত্র পরাগল খাঁ ও তৎপুত্র ছুটি খাঁ উত্তর চট্টগ্রামের শাসক করতেন পরাগলপুরে রাজধানী স্থাপন করে। এসময় চট্টগ্রামের অধিকার নিয়ে ত্রিপুরা ও আরাকানী সৈন্যদের সাথে মুসলিম সৈন্যদের যুদ্ধ হয়। ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা ধন্যমানিক্য চট্টগ্রাম জয় করেন। কিন্তু সহসাই গৌড়ের অধীনে চলে আসে চট্টগ্রাম। এসকল যুদ্ধে আলা উদ্দিন হোসেন শাহ কে মতামত্মরে নসরৎ শাহকে সৈয়দ আলফা হোসাইনী নামক বাগদাদেন বনী হাশেমী এক বনিক যুদ্ধ নৌকা , অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। স্বয়ং সুলানের পরিবারের সাথে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কে স্থাপিত হয়। জানা যায় ,১৫১১ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আলফা হোসাইনী চট্টগ্রাম আসেন। তিনি ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের মালিক ছিলেন। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর হোসেন শাহ ( মতামত্মরে নসরৎ শাহ) আলফা হোসানীকে অনেক ভূসম্পতি প্রদান করেন এবং তিনি স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে বসবাস শুরম্ন করেন। চট্টগ্রাম শহরের কাজীর দেউরীর বিখ্যাত কাজী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মীর আবদুল গণির তিনি পূর্বপুরম্নষ ছিলেন। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর সুদূর গৌড়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা , চট্টগ্রামের সুরক্ষা এবং সৈন্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের থাকা এ যাতায়াতের সুবিধার্থে হোসেন শাহের আমলে চট্টগ্রামে একাধিক সরাইখানা বা মেহমানসরাই প্রতিষ্ঠা করা হয়। কথিত আছে এসকল মেহমান সরাই বা সরাইখানা প্রতিষ্ঠা করেন সৈয়দ আলফা হোসাইনি । জানা যায় , সে সময় ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রাম পৌছা পর্যমত্ম অমত্মতঃ চারটি স্থানে সৈন্যরা বিশ্রাম নিতেন। স্থানগুলো হচ্ছে বুড়বুড়িয়া , মীর কা সরাই, সীতাকুন্ড ও কদমরসুল । সেসময়কার ইতিহাসে উত্তর চট্টগ্রামে অমত্মতঃ দু’টি সরাইখানার নাম পাওয়া যায় একটি মীর কা সরাই অপরটি ভাটিয়ারীতে। বস্ত্ততঃ ফেনী নদী পার হয়ে একটি রাসত্মা জোরওয়ারগঞ্জ হয়ে ( পরাগলপুরের ভেতর দিয়ে) মীরসরাই ও সীতাকুন্ড হয়ে চট্টগ্রাম পর্যমত্ম পৌছেঁ যায়। এটিই সেকালে গ্র্যান্ড ট্র্যানক রোড বা ‘ফখরম্নদ্দীনের পথ’ নামে পরিচিত , যার চিহ অদ্যবধি বিদ্যমান। মীরসরাইতে যে মেহমানসরাই প্রতিষ্ঠিত হয় তা পরিচালনার ভার অর্পন করা হয় জনৈক মীর সাহেব নামে কোন সুফী ব্যক্তির উপর। কেউ কেউ তাঁকে সৈনিক বলেও অভিহিত করেছেন। এই মীর সাহেব মেহমানসরাইতে সারাজীবন অতিবাহিত করেন এবং তাঁর নামানুসারে এই সরাইখানা বা মেহমানসরাইটি মীর কা সরাই নামে পরিচিত হয়। স্কটল্যান্ডের অধিবাসী ও বৃটিশ ইন্ডিয়ার বিখ্যাত সমীক্ষক ফ্রান্সিস বুকানন ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চ তারিখে চট্টগ্রাম ভ্রমণে যান। তিনি তাঁর ভ্রমন বৃত্তামেত্ম লিখেছেন ‘‘ বিকাল ৩টা নাগাদ আমি ফেনী বাংলো ত্যাগ করলাম । তারপর আরো ১২মাইল ভ্রমণের পর পৌছুলাম মীর খা সরাই। যাত্রীদের জন্য এখানে ও থাকার একটি ব্যবস্থা আছে । ’’ তিনি ১১মে তারিখে চট্টগ্রাম ভ্রমন শেষে ফেরার সময় মীর খা সরাইতে রাত্রিযাপন করেন এবং জোরারগঞ্জ হয়ে লক্ষ্ণীপুরের দিকে যাত্রা করেন। এই মীর খা সরাই বা মীর কাসরাই পরবর্তীতে মীরসরাই নামে পরিচিতি লাভ করে । কিন্তু এই মীর সাহেব সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না । ( এই সম্পর্কে বিসত্মারিত জানার জন্য মৎ প্রণীত ‘ মীরসরাই’র ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি ’ জুলাই ২০০৪ প্রথম অধ্যায় পৃষ্ঠা ৪৭-৫১) । এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে মীরসরাই অঞ্চলে অবস্থিত মেহমারসরাই বা সরাইখানাটি পরিচালনার দায়িতে ছিলেন কোন অজ্ঞাতনামা মীর সাহেব। তিনি মীর গফুর খাঁ নামে পরিচিত । গফুর খাঁ সাহেবের পুত্র পরিচিত চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ চট্টগ্রামের নিজামপুর পরগনার বিখ্যাত জমিদার ও ঐতিহাসিক ব্যক্তি । তিনি তৎকালীন সরকার থেকে বিপূল পরিমাণ সম্পত্তির মালিকানা পান । তাঁর একমাত্র কন্যার বিবাহ দেন বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের দোহাজারী দুর্গের অধিপতি ও এক হাজারী মনসবদার আধু খাঁর পুত্র শের জামাল খাঁর সাথে । উপহার হিসেবে মূল্যবান জিনিসপত্রের সাথে বাঁদী -গোলাম , মোলস্না-কাজী ও ক্বারী কয়েক ঘর দেওয়া হয়েছিল । খুব ধুমধামের সাথে এই বিয়ে হয়, যা চট্টগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ গুরম্নত্বের সাথে উলেস্নখ করা হয়। চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁর দুই পুত্র চৌধুরী দেয়ানত খাঁ ও চৌধুরী আমানত খাঁ । চৌধুরী আমানত খাঁ চিরকুমার ছিলেন । দেয়ানত খাঁ বিবাহ করেন চট্টগ্রামের প্রাচীন বনেদী ও সৈয়দ আলফা হোসানীর বংশধর মীর আবদুল গণির পেীত্র মীর এহিয়ার (চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রয়েছে তাঁর। )তিন কন্যার অন্যতম আয়মনা বিবিকে। এই দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন হাড়ি বিবি্। তিনি ও চিরকুমারী ছিলেন । শোনা যায় উপযুক্ত পাত্র পাওয়া না যাওয়ায় না তিনি বিবাহ করেননি্ । অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি মারা যান্ । কোন উত্তরাধিকারী রেখে না যাওয়াতে বাকী খাজনার দায়ে (মতামত্মরে চক্রামত্মমুলকভাবে) এই পরিবারের বিপুল সম্পত্তি (যা তরফ আমানত -দেয়ানত নামে পরিচিত) নিলামে বিক্রি হয়। কলকাতার খিদিরপুরের বাসিন্দা ইসলামাবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম চিফ হ্যারি ভেরলেস্ট এর দেওয়ান গোকুল চন্দ্র ঘোষাল তার ভ্রাতুস্পুত্র জয়নারায়ণ ঘোষোলের নামে খরিদ করে নেন। খিদিরপুর ভূকৈলাসের নামানুসারে মীরসরাই’র আবুতোরাব বাজারের নামকরণ হয়্। কৈলাসগঞ্জ বাজার । ( এই সংক্রামত্ম বিসত্মারিত জানার জন্য মীরসরাইর ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি পৃষ্ঠা ৫৪-৫৬ এবং ৬৬৫-৬৬৮)। মীর গফুর খাঁ তৎপুত্র চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ ও এই বংশের অন্যান্যদের কে মৃত্যুর পর সরাইখানা সংলগ্ন গফুর খাঁ (গোভনীয়া ) দীঘির পশ্চিম পাড়ে দাফন করা হয় । বিশ শতকের পঞ্চাশ দশক পর্যমত্ম এলাকাটি জঙ্গলাকীর্ণ ছিল । আমবাড়িয়া নিবাসী জনৈক সেকান্দর হাজী জায়গাটি স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে খরিদ করেছিলেন। তিনি বন জঙ্গল পরিস্কার করার সময় পাকা কবরের সন্ধান পান এবং মীর গফুর খাঁ সাহেবের কবর বলে শনাক্ত করে সমাধি ভবন তৈরী করেন। সম্মানিত মীর গফুর খাঁ সাহেবের এটি সমাধি , যা ঢাকা - চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বিদ্যমান। মীরসরাই থানা (পুলিশ ক্যাম্প) ভবনের কিঞ্চিৎ দক্ষিণে এটি অবস্থিত। এখন প্রশ্ন হল তৎকালীন ইসলামাবাদের উত্তর-পশ্চিমাংশের মীর কা সরাই বা সরাইখানাটি যিনি দেখাশুনা করতেন সেই মীর সাহেব বা মীর গফুর খাঁ সাহেব আর পরবর্তী নিজামপুর পরগনার প্রখ্যাত জমিদার চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ (কাজিয়ার খাঁ ?)র পিতা মীর গফুর খাঁ একই ব্যক্তি? অন্ততঃ তিনটি বিবেচনা একই ব্যক্তি হতে পারেন। সময়কাল , তৎকালীন শাসকদের সাথে সুস্পর্ক ও উত্তরাধিকারী এই তিনটি বিষয় পর্যালোচনা করা আবশ্যক। একই সাথে গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয় হলো মীর কা সরাই কখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে , সুলতানী আমলে না মোগল আমলে ? এই বিষয় ও পরিস্কার হওয়া দরকার । তবে চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁর পিতা মীর গফুর খাঁই ছিলেন মীর কা সরাই এর তত্ত্বাবধানকারী এই সত্যকে ধরে এগোলে প্রমাণিত হয় সরাইখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয় মোগল যুগে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি বুজর্গ উমেদ খাঁ কর্তৃক চট্টগ্রাম দখলের পর । এসময় বিজিত অঞ্চলের নামকরণ হয় ইসলামাবাদ । সময়কাল বিবেচনায় আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বা নসরৎ শাহ’র শাসনকালে সৈয়দ আলফা হোসানী কর্তৃক সরাইখানা প্রতিষ্ঠিত হলে সেটা ১৫১৬-৩২ খ্রিস্টাব্দে মধ্যেকার সময় হবে । এসময় ইসলামাবাদ নামে অঞ্চলে বা নিজামপুর পরগনার অসিত্মত্ব মিলবে না এবং জমিদার চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁর জমিদারীর চিমত্মা ও অযৌক্তিক । দোহাজারী দুর্গের অধিপতির সুযোগ্য পুত্র শের জামাল খাঁর সাথে তাঁর কন্যার বিবাহ হলে সময়টা হতে পারে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের পর । অপরদিকে চৌধুরী দেয়ানত খাঁ বিবাহ করেন চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ির মীর আবুল গণি (সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের লোক যিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে ইসলামাবাদের কাজী ও মূফতি ছিলেন) এর পুত্র মীর আবদুল রশিদ (জম্ম-সপ্তদশ শতকের শেষার্ধ ,যিনি দিলিস্নর সম্রাট আহমদ শাহ ( ১৭৪৮-৫৪ খ্রিঃ) এর শাসনকালে বাংলার নবাব কর্তৃক ৬০ দ্রোন নিস্কর জমি পান) এর পুত্র মীর এহিয়ার কন্যাকে। ১৭৫৪ সালের দিকে মীর আবদূল রশিদ বার্ধক্যে উপনীত হন এটা নিশ্চিত এবং মীর এহিয়া সেসময় পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন ধরে নেওয়া যায়্। অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে এই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। ঘটনাবলী এরকম হলে মীর গফর খাঁ , তৎপুত্র চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ তৎপুত্র দেয়ানত খাঁ ও আমানত খাঁ এবং দেয়ানত খাঁর কুমারী মেয়ে হাড়ি বিবির সময়কালের সাথে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগলদের চাটিগ্রাম বা চট্টগ্রাম বিজয় ও এই অঞ্চলে মেহমানসরাই বা মীরখা সরাই এর পরিচালনার বিষয় ধারাবাহিক মিল পাওয়া যাচ্ছে্ । উত্তরাধিকারী না থাকাতে এই জমিদারী নিলামে বিক্রির ঘটনা ও ঘটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইসলামাবাদ অধিকারের পর। দ্বিতীয়ত - সরাইখানা বা মেহমান সরাই প্রতিষ্ঠার পর এর পরিচালনার ব্যয়ভার বহনের জন্য আশপাশে কয়েকগ্রাম ও সম্পত্তি নিস্কর করে দেওয়া হয়েছিল , যা ছিল মোগল আমলের প্রচলিত রীতি। পিতার মৃত্যর পর মীরকা সরাই পরিচালনা এবং একই সাথে সম্পত্তির মালিকানা স্বত্ব লাভ করেন চৌধুরী কাদির ইয়ার খাঁ। চট্টগ্রামের ইতিহাসে চৌধুরী কাদির ইয়ার খাঁ ,তারঁ বংশধর ও তাঁদের পরিণামের কথা উলেস্নখ পাওয়া যায়। এই পরিবারের সমাধির সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানা যায় মঘাদিয়া নিবাসী সাবেক সাব ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এসএম সিদ্দিক আহমদ লিখিত পারিবারিক ইতিহাস থেকে। পক্ষান্তরে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বা তৎপুত্র নাসিরম্নদ্দীন নসরৎ শাহ এর আমলে সৈয়দ আলফা হোসাইনী কর্তৃক মেহমানসরাই প্রতিষ্ঠিত এবং মীর গফুর সাহেব নামক কোন অজ্ঞাতনামা সৈনিক বা সুফী দরবেশ কতৃর্ক পরিচালিত হয়ে থাকলে তাঁর সাথে নিজামপুর অঞ্চলের ইতিহাসেখ্যাত জমিদার চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ বা কাজিয়ার খাঁর কোন সম্পর্ক কালের নিরিখে মেলে না । সে ক্ষেত্রে মীর গফুর খাঁ সাহেবের কথিত সমাধি ভবনের ও কোন হদিস পাওয়া যাবে না । কারণ এখানে যে কবর রয়েছে তা চৌধুরী কাদির ইয়ার খাঁর বংশধরদেরই কবর ( এসএম সিদ্দিক আহমদ সাহেবের সাÿ্য অনুযায়ী)। এখানে প্রসঙ্গেক্রমে আর একটা কথা বলে নেওয়া দরকার । তাহলো , মীর কা সরাই অর্থাৎ সরাইখানা প্রতিষ্ঠা তৎকালীন জাফরাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা (দিলিস্নর সম্রাট শের শাহের ভাই) নিজাম শাহ সুরের (ষোল শতকের মধ্যভাগে ) আমলেও হতে পারে । কারণ শের শাহের আমলে ভারতবর্ষে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা , ডাক বিভাগ ও সরাইখানার ব্যাপক প্রচলন হয়েছিল । সাম্রাজ্যের সার্বিক খোজঁখবর নেওয়া , প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদুঢ় করা ও দ্রুত সংবাদ আদান প্রদানের ক্ষেত্রে শের শাহ এর শাসনকাল আধুনিক যুগোপযোগী ও যা ছিল বর্তমানের অনুকরণীয় । সে সময়কালে মীরকাসরাই প্রতিষ্ঠিত হলেও নিজামপুরের জমিদার চৌধুরী কাদের খাঁর পিতা গফুর খাঁ ও সরাইখানার তত্ত্বাবধানকারী মীর সাহেব ভিন্ন ব্যক্তি। ইসলামাবাদের উত্তর পশ্চিমাংশে গুরম্নত্বপূর্ণ অঞ্চল টিতে (যে সময়েই হউক) যে সরাইখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তার পরিচালক বা তত্ত্বাবধানকারী সেই মীর সাহেবের নামে মীর কা সরাই এবং যা থেকে পরবর্তী কালে মীরসরাই নামকরণ হয়েছে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

মীরসরাই নামের বানান বিভ্রাটঃ

নামকরণ ও মীর সাহেবের পরিচিতির মত মীরসরাই নামের বানান নিয়েও চলছে নানান বিভ্রামিত্মমুলক প্রচারণা । সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমত বানান লিখে চলেছেন। এই যাবত ৩১রকম বানান দেখতে পাওয়া যায়। মিরেরসরাই ,মরেরশরাই, মীরেরশ্বরীই, মীরেরস্বরাই,মীরসরাই,মিরসরাই, মিরশ্বরাই, মিরশরাই, মিরছরাই, মীরছরাই, মিরছরি, মেরছরাই,মীরশ্বরী, মিরশ্বরি, মীরশ্বোরাই, মীরছোরাই,মীরকা সরাই, মীরকাছরাই, মীরকে সরি , মীরকেছরি , মীরকেছরি , মীর কা ছরি , মিরেশ্বরী,মীর খা ছরাই ও মীরসরাই। প্রসঙ্গে উলেস্নখ্য যে , মীরসরাই নামকরণ হয়েছে সরাইখানার পরিচালক বা তত্ত্বাবধানকারী জনৈক মীর সাহেব এর নামে প্রথমে মীরকা সরাই থেকে পরবর্তীকালে এই মীরকা সরাই সংক্ষিপ্ত রূপ প্রাপ্ত হয়ে মীরসরাই নামকরণ । ১৯৮৩ সালের ১৫এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ এর শাসনামলে মীরসরাইকে উপজেলা হিসেবে ঘোষনা করে এবং এর কার্যক্রম হয় ৬ অক্টোবর্। কিছু দিনের মধ্যে প্রথম উপজেলা নিবার্হী অফিসার এম, আলী আহমদ এক সার্কুলার জারি করেন ‘ মীরসরাই ’ বানান শুদ্ধভাবে এবং একই নিয়মে লেখার জন্য । যেহেতু মীর সাহেব নামক ব্যক্তি সরাইখানা পরিচালনা করেছেন এবং তারঁই নামের স্মারকরূপে এই প্রাচীন জনপদের নামকরণ হয়েছে্ । কিন্তু দীর্ঘ পঁচিশ বছরেও এই সার্কুলার কার্যকর করা যায়নি । বাংলাদেশের জন্য কোন অঞ্চলে এমন দৃষ্টামত্ম নজির বিহীন । এই বিষয়ে মীরসরাই’র সাংবাদিক , সহিত্যিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে কিন্তু পরিতাপের বিষয় তাঁদের ভূমিকা এই বিভ্রামিত্ম ও বিকৃতি নিরসন করতে পারেনি । এক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদক্ষেপই কাম্য। ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থানঃ হিঙ্গুলী কোটেরপাড়ঃ বাংলাদেশের প্রাচীন যুগের সামরিক নিদর্শনাদি বিশেষতঃ পাথুরে স্থাপনা বেশি নেই। এখানকার মাটি বালুকাময় ও পলিমিশ্রিত । নদী নদী ও নরম মাটির পাহাড় বেষ্টিত চট্টগ্রামে পাথর সহজলভ্য নয়। তাই প্রাচীন ও মধ্যযুগে নিত্য যুদ্ধ বিগ্রহের সময় ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে প্রচুর দুর্গ নির্মিত হলেও চট্টগ্রামে মাটির দুর্গই বেশী নির্মিত হয়েছে। মীরসরাই থানার হিঙ্গুলীতে আরাকানী শাসনামলে নির্মিত একটি মাটির দুর্গ রয়েছে । আরাকানীরা উত্তর পশ্চিম দিক থেকে ত্রিপুরা ও গৌড়ীয় সেনাবাহিনীর অগ্রাভিযান প্রতিরোধ করতে এই দুর্গ নির্মান করে। একটা বিরাট এলাকার চারপাশে মাটির উঁচু পাড় ও চার পাড়ে চারটি বিশালাকার দরজা বিশেষ । এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরাকানী যুগের প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক নির্দশন। কিন্তু কালের ভয়াল আক্রোশ থেকে সাত শতাধিক বছর রক্ষা পেলেও মানুষের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পায়নি এই ঐতিহাসিক নিদর্শন। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব ও দক্ষিণ পাড় সম্পূর্ণ অক্ষত এবং উত্তর পাড় আংশিক (পশ্চিম পাড় হিঙ্গুলী খালের ভাঙনে বিলীন) টিকে থাকলেও ইটভাটা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মাটির এই দুর্গটি কোটের পাড় নামে পরিচিত এবং কোটের অভ্যন্তরে ৫০ একরের বেশি জমি ছিল। ছোট আকৃতির পাহাড় সমান পাড়গুলি ইটভাটায় ইট প্রস্তুতকারীদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়েছে (কোট বা দূর্গের ছবি ও তথ্য জানতে- মীরসরাই'র ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি পৃষ্ঠা-১৬৫)।

 

ধুমের শিলা পাথর :

মিরসরাই'র উত্তর-পশ্চিম দিকে ফেনী নদীর নিকটে ধুম গ্রামে এক প্রাচীন শিলালিপি দেখা যায়। শান্তিরহাট বাজারের অতি নিকটে রাস্তার পাশে এই শিলাপাথরটি মাটির গভীরে পর্যন্ত অবস্থান করছে। ১৯৮০ সালের দিকে হাতি দিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করে এলকাবাসী, কিন্তু ব্যর্থ হয়। পাথরটির এক পাশে কিছু লিপির অস্তিত্ব রয়েছে এবং দেখতে কোন আসনের মতোই মনে হয়। শিলা পাথরটি দেখতে পার্শ্ববর্তী ছাগলনাইয়া থানার শিলুয়া গ্রামের পাথরের অনুরূপ। সেই পাথরের গায়ে উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকৈ এখানে ০৫ হাজার বছরের পুরানো আর্য সভ্যতা বিকাশের প্রমাণ পাওয়া যায়। আকারে এত বড় না হলেও রং ও লিপির অস্তিত্ব এর প্রাচীনত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ মহলের দৃষ্টি দেওয়া দরকার। কারণ মিরসরাই অঞ্চলও অতি প্রাচীন জনপদ এবং পার্শ্ববর্তী সীতাকুন্ড পর্বতে ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রাগৈতিহাসিক যুগের কিছু নিদর্শন আবিষ্কার হওয়াতে এখানে আট থেকে দশ হাজার বছর আগে আদি মানুষের বসবাস ছিল বলে ধারণা করা যায়। সেই বিবেচনায় ধুমের শিলাপাথরটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। [দ্রষ্টব্য-প্রাগুক্ত]

 

শুভপুর ব্রীজ :

ফেনী নদীর উপর ১৯৫০ এর দশকে নির্মিত হয় এই অঞ্চলের দীর্ঘতম সেতু। তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান শুভপুর সেতুর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন। বৃহত্তর নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলার সীমানায় সেতুটি অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে পাকিস্তানি সৈন্যরা এই সেতু দখল করে নেয়। প্রথমে ২৯ মার্চ সীমিত আকারে ও ২৯ মার্চ প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে বাঙালি ইপিআর-আর্মি মিলিতভাবে সেতু দখল করে। ৭ জন পাকিস্তানি সৈন্য এবং ৩ জন বাঙালি সৈন্য নিহত হয়। ২০ এপ্রিলের পর থেকে এই সেতুর দখল নিয়ে উভয় পক্ষে তৃমুল যুদ্ধ হয়। ১২ মে শুভপুর সেতু পাক সেনাদের দখলে চলে যায় এবঙ বিজয়ের পূর্ব মুহুর্তে পলাযনকালে পাকিস্তানিরা ডিনামাইট বসিয়ে ব্রিজ ধ্বংস করে দিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই ব্রিজে বহুসংখ্যক বাঙালিকে ধরে এনে পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার বাহিনী হত্যা করে। এখানকার যুদ্ধ ঘটনাবলী নিয়ে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সরকারি অর্থায়নে কলমীলতা নামে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি নির্মিত হয় ও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধ বিষয়ক প্রশিক্ষণে এই শুভপুর সেতুর যুদ্ধ বিশেষ গুরুত্ব পায়। ১৯৯৬ সালে বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ও অংশগ্রহণে শুভপুর সেতু নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামান্য চিত্র সরজমিনে মহড়া অনুষ্ঠিত হয় ও তা টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাইজে এক ব্যর্থ সেনা বিদ্রোহে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সরকারি অনুগত ও অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারী সৈন্যদের মুখোমুখি অবস্থানের মাধ্যমে শুভপুর ব্রীজ পুনরায় ইতিহাসে চলে আসে। তাছাড়া এই সেতু ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একমাত্র সেতু রূপে গুরুত্ব পায়। ১৯৯৩ সালে ফেনী নদীর ভাঙনে সেতুর পশ্চিম অংশ স্থলভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। 

শুভপুর সেতু ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়া ও দেশের অর্থনৈতিক ও পর্যটন শিল্পে বিশেষ পরিচিত আছে। সেতু এলাকায় নদীর উভয় তীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে দূরাঞ্চল থেকে পর্যটকদের আগমণ ঘটে। পরিকল্পিত ভাবে পিকনিক স্পট ও বনায়ন করা হলে শুভপুর সেতু অঞ্চল দেশের পর্যটন শিল্পে স্থঅন করে নিতে পারবে। নদীপথে মালামাল আনা নেওয়া ো বালু মহাল ইজারা দিয়ে সরকারি ভাবে প্রচুর অর্থ পাওয়া যায়। (বিস্তারিত প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৬৭-৬৯)

মুহুরী সেচ প্রকল্প :

 

 

সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা: উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী, মীরসরাই