মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে মীরসরাই

 

মীরসরাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মানবতাবিরোধী ও হিংস্র ঘটনাটি ঘটে মীরসরাই বাজারে বিকেলের সেমৌম্য শান্ত পরিবেশে থানার প্রাণ কেন্দ্র মীরসরাই বাজারে সাধারণ জনগণ বেচাকেনায় ব্যস্ত। ঠিক সেই সময়ই উড়ন্ত জেট বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে পাকবাহিনী নিষ্ঠুর হায়েনারা। অমানবিক এ আঘাতের শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ১০/১৫ টি তাজা প্রাণ, আর আহত হয় শতাধিক।

এ ঘটনার পর মীরসরাই এর পরিবেশ পাল্টে যায়। প্রতিবাদে প্রতিবাদে মুখরিত হয়ে উঠে প্রতিটি এলাকা। গণজাগরন দৃঢ় হয় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে, সময়ের ক্ষরণ অসহ্য হয়ে উঠে মুক্তিকামী জনতার। নেতৃবৃন্দের মন্ত্রণাসভায় ঠিক হয় শুভপুর ব্রী মুক্ত করা হবে। এপ্রিলের প্রথম ভাগের দিকে এক নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের, ক্যাপ্টেন মাইনুদ্দিন ও দারোগা নুরুল হকের নেতৃত্বে বেংগল রেজিমেন্টের সৈনিক ই.পি.আর. এবং সাধারণ জনগণের উপর্যুপরি হামলায় শুভপুর ব্রীজ মুক্ত হোয়ার সাথে সাথে এলাকার জনগণের মনোবল বেড়ে যায়। শুভপুর ব্রীজ মুক্তকরণ যুদ্ধে ৬/৭ জন পাক সৈন্য নিহত হয়। কিছুসঙখ্যক সৈন্য ব্রীজ সংলগ্ন পার্শ্ববতী ইউনিয়ন করেরহাটে পালিয়ে যায়। ব্রীজ মুক্তকরণের কাজে করেরহাটের জনগণ যে অভাবনীয় দু:সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে তা স্মরণীয়। এ অভিযানে এলাকার ছাত্র জনতার মধ্যে যারা অংশগ্রহণ করেন তাদের মধ্যে এ.টি.এম. ইসমাইল, জাফর আহমদ, মোশাররফ, তবারক হোসেন আলাউদ্দিন প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। ব্রীজ মুক্তকরণ অভিযানে শহীদ হন তাজুল ইসলাম, নুরুল গনি ও জাকের হোসেন।  

       শুভপুর ব্রীজ মুক্তির সাথে সাথে উদ্দীপনা বেড়ে যায় জনগণের মধ্যে। সাহসের পরিসীমা বৃদ্ধি পায় ক্রমাগত। বাড়তে থাকে যোদ্ধাদের সংখ্যা। ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ, ক্যাপ্টেন মতিন, ক্যাপ্টেন রিফকের নেত্রত্রে এলাকার গুরুত্বপূন স্থানসমুহে গেড় উঠেছ দুর্ভেদ্য দুর্গ । স্থানসমুহের মেধ্যে ফেনাফুনীর ব্রিজ সংলগ্ন হাজারী দিঘির পাড়, আমবাড়িয়া গ্রাম,মো:  মিয়ার পুল ও মস্তাননগর উল্লেখযোগ্য। ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়। প্রতীক্ষার গ্রহর গুনে জনতা,অপরিদকে নিবিদ্র রাত কাটে ছাত্রনেতাদের । এলাকার প্রতিটি অঞ্চলে চলে মুক্তিযোদ্ধ উত্তরেণর কাজ। মীরসরাইর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দেয় বাঙালি সৌন্য বিভিন্ন দুর্গে। যেকোন মুহুর্তে আক্রমন হতে পারে এ আশংকা সর্বোচ্চ সর্তকাবস্থায় আছে বাঙালি সৌন্য ও মীরসরাইর মুক্তিযোদ্ধারা। ২০ এপ্রিল তাণ্ডবতায় এক ভয়াবহ দিন মীরসরাই জন্য। মীরসরাইতে মুক্তিযোদ্ধকালে যতগুলো সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে তার মেধ্য এদিনের যুদ্ধটি সবচেয়ে ভয়াবহ ও স্মরণীয় । সেদিন এলাকার সর্বস্তরের জনতা ঝাপিয়ে পড়েছিল সম্মুখ যুদ্ধে। নিত্যদিনের মত ভয় আর শংখা নিয়ে ঘুম ভাংগে মুক্তিযন্ত্রনকামী মীরসরাইবাসীর। ঘুমের রেশ কাটতে না কাটতেই গগনিবদারী শেব্দ চমেক উঠে সমস্ত এলাকা।হাজার হাজার পাকবাহিনী ও বহর এগিয়ে যায় সাজোয়া বহর মীরসরাইবাসীর। দানবের মতো চিংকার করতে  করতে এগিয়ে যায় সাজোয়া বহর মীরসরাইর দিকে। সারা পথ নিবেঘ্ন অতিক্রান্ত হল ও চরম বাধার সম্মুখীন হয় ফেনাফুলী ব্রীজের (পুল) কাছে এসে। ক্যাপ্টেন অলি ,ক্যাপ্টেন মতিনের নেতৃত্বে শুরূ হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ,মুহুর্মুহু আক্রেমনে চুর্ণ বিচুর্ণ হয়ে যায় এলাকার আবাস্থল। এভাবে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হবার পর বিশাল বাহিনীর বাঙালি সৌন্যরা বিপর্যয় হয়ে পিচু হঠলে পাক বাহিনী নিরহ জনগণের উপর চালায় অমানবিক অত্যাচার। পার্শ্ববর্তী ফেনাপুনি, আমবাড়িয়া, খৈয়াছরা, গোভনিয়া, সৈদালী, তেলীগ্রাম, মীরসরাই সদর ও বড়তাকিয়ায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। পুরো এলাকাকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে হানাদার দল সামনের দিকে অগ্রসর হয় এবং মীরসরাই থানা সদরে আস্তানা গড়ে। এ যুদ্ধে শতাধিক পাকসেনা নিহত হয় এবং বিপুল পরিমান সাজোয়া বহরের ক্ষতিসাধিত হয়। বাংগালী সৈন্যরা এ যুদ্ধে পরাজিত হয়েও এটিকে অভিজ্ঞতা হিসাবে ধরে নিয়েছিল। মনোবল তাদের নষ্ট হয়নি।

       দৃঢ় মনোবলে তারা আবারো জড়ো হয় পরবর্তী প্রতেরোধের জন্য। গোপন সংকেতের মাধ্যমে সবাই গিয়ে জড়ো হয় মস্তাননগরের দুর্গে, অপেক্ষায় থাকে পরবর্তী আক্রমনের জন্য। এ প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন অলি ো নায়েক কালাম।হাবিলদার ছিদ্দিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীত হন। যুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখেন ল্যান্স নায়েক আবুল হোসেন, হাবিলদার ছিদ্দিক, সুবেদার সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।

        ২৫ এপ্রিল পাক বাহিনী মীরসরাই সদর হতে অগ্রসর হয় উত্তর দিকে। তাদের লক্ষ্য শুভপুর ব্রীজসহ পুরো মীরসরাই তাদের দখল নেয়া। বিশাল বাহিণী এবং বহর সজ্জিত হানাদার বাহিনী যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মস্তাননগর এ দূর্গ গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধারা। শুরু হয় আক্রমন। এখানে মুক্তিযোদ্ধারা পিচু হঠলে পাক বাহিনী এলাকার ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, শিশুদের জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে, নিরিহ নারী পুরুষের উপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে শুভপুর ব্রীজসহ পুরো মীরসরাই এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

       হাজারো ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েো মীরসরাই আপোষহীন স্বাধীনতাকামী জনতাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। স্বাধীণতাকামী হাজারো মীরসরাইবাসী পাড়ি জমায় োপার বাঙলার হরিনা ক্যাম্পে। গেরিলা যুদ্ধে দিক্ষিত হোয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে সকল পিচু টান উপেক্ষা করে দিনের পর দিন বাড়াতে থাকে মানুষের ঢল। নেতৃবৃন্দের সু-শৃংখল তত্ত্বাবধানে গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষ করে আবারো এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন যোদ্ধারা। মীরসরাই ো হরিনা ক্যাম্পের সাথে যোগাযোগ, গেরিলা যদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ো নেতৃত্ব দেন ফজলুল হক বিএসসি, মোশাররফ হোসেন ইঞ্জিনিয়ার, এ্যাডভোকেট আবুল কাশেম, জিতেন্দ্র প্রসাদ নাথ মন্টু, এ.টি.এম. ইসমাইল, এবায়দুর রহমান, তাহের আহামদ, োবায়দুল হক খন্দকার, নুরুল হক, মির্জা ফিরোজ আহমেদ, এনায়েত উল্লাহ, আবদুল খালেক, কেপায়েত উল্লাহ, ডা: হামিদুল্লাহ, এবাদত উল্লাহ, জাফর আহমেদ, আবু জাফর ছায়েদ, মোশারফ হোসেন, আলী আকবর চেৌধুরী, আবদুল হাই চেৌধুরী, অহিদুর রহমান, খোরশেদ আলম, নুরুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম সোলেমান, শেখ আবুল কাশেম, খোরশেদ আলম, আলতাফ হোসেন প্রমুখ।